মাহে শা’বান মাসের বিশেষ আমল
মাহে শা’বান
[১ম রাত এবং প্রতিদিনের বিশেষ আমল]
হিজরী বর্ষের ৮ম মাস মাহে শা’বান। আল্লাহর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এ মাসকে স্বীয় মাস হিসেবে আখ্যায়িত করে এরশাদ করেন, “শাবান আমারই মাস, এ মাসের শ্রেষ্ঠত্ব অপরাপর মাসগুলির উপর সেরূপ, যেমন আমার শ্রেষ্ঠত্ব সমস্ত মাখলুকের উপর।”
শাবান আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হওয়া। এ মাসে আল্লাহর অপরিমেয় রহমত ও করুণার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়; যাতে বান্দাগণ স্বীয় গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারে এবং সমস্ত নেক মাকসুদ হাসিল করতে সক্ষম হয়। মহান রমযানকে যথাযথভাবে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের মাস হিসেবে শা’বান মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে আলােড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষত এ মাসের ১৪ তারিখের দিনগত রাতই শবে বরাত হিসেবে পরিচিত। মুসলিম দেশসমূহে অতি গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হয়ে থাকে এ রাতটি। এ রাতের বহু ফযিলত রয়েছে।
- চাঁদ দেখে পড়ার দোয়া
রজব মাস ও শাবান মাস প্রবেশ করলে প্রিয় নবীজি ﷺ এই দোয়াটি বেশি পাঠ করতেন,
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা বা-রিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বানা ও বাল্লিগনা রামা্দ্বান।”
অর্থ: “হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দাও। আর আমাদেরকে রামাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।”
(মুসনাদ আহমাদ ১/২৫৯, ইমাম বায়হাকী- শুয়াবুল ঈমান হাদিস নং ৩৫৩৪, ইমাম তারবানী- আল আউছাত হাদিস নং ৩৯৩৯)
- প্রতিদিনের দোয়া
শাবান মাসের প্রতিদিন নামাযের পর এ দোআ পাঠ করা গুনাহ মাফের জন্য অতি উত্তমঃ
استغفر الله العظيم الذي لا اله الا هو الحى القيوم اليه توبة عبد ظالم لا
يملك نفسه ضرا ولا نفعا ولا موتا ولا حيٰوة ولا نشورا
উচ্চারণ : আস্তাগফিরুল্লা-হাল আযী-মাল্লাযী লা-ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ইলাইহি তাওবাতু আবদিন যা-লিমিল লা-ইয়ামলিকু নাফসাহ্ দ্বররাও ওয়ালা- নাফ‘আওঁ ওয়ালা মাওতাওঁ ওয়ালা হায়া-তাও ওয়া লা- নুশূ-রা। [বারো মাসের নফল ইবাদত, গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব]
- তিন হাজারবার দরূদ শরীফ
রসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, শা’বান মাসে কেউ তিন হাজার বার দরূদ শরীফ পড়ে আমার নিকট পেশ করলে হাশরে দিনে তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য অবধারিত হয়ে যায়। [বারো মাসের নফল ইবাদত, গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব]
- ১ম রাতে বা যেকোনো রাতে খাতুনে জান্নাত (রা) কর্তৃক একটি বিশেষ নামাযের শিক্ষা:
হযরত শেখ আবুল কাশেম ছগগার (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার হযরত খাতুনে জান্নাত (রা) কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কী পছন্দ করেন এবং আপনার রূহ মোবারকে কি বখশিশ করলে আপনি খুশী হবেন? উত্তরে খাতুনে জান্নাত (রা) বলেন,
❝শাবান মাসের যে কোন একদিন এক সালামে ৮ রাকাত নামায চার বৈঠকে আদায় করবে। প্রত্যেক রাকাতে সূরায়ে ফাতেহার পর ১১ বার সূরা ইখলাস পড়বে এবং ঐগুলির সওয়াব আমার উপর বখশীশ করে দিবে। হে আবুল কাশেম! যে কোনো ব্যক্তি আমার এই নামায ঐ শাবান মাসের যে কোন এক রাত্রিতে আদায় করবে। আর যদি প্রথম_রাত্রিতে পড়ে তাহলে অনেক ভাল। তা না হলে যে_কোন_এক_রাতে পড়বে। সেই ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করা ব্যতীত আমি বেহেস্তে প্রবেশ করব না।❞
[ফযায়েলে শুকর ওয়াস সিয়াম, ২৪ পৃষ্ঠা, কৃত: মাওলানা রমজান আলী হানাফী]
[অর্থাৎ_এক সালামে ৮ রাকাত নামাজ অর্থাৎ, একটি নিয়তে ৪ বৈঠক(৪ তাশাহুদ)—
২ রাকাত পর তাশাহুদ পড়ে আবার দাড়িয়ে যাবেন, এরকম
২ রাকাত পর পর তাশাহুদ আদায় করে একেবারে ৮ম রাকাতে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাছুরা পড়ে নামায সমাপ্ত করবেন।]
নাওয়াইতু আন্ উসল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা সামানি রকা’আতি সলাতিন নাফলি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
- ১ম রাতের আমল:
বারো রাকাত নফল নামাজ:
পবিত্র হাদিসে এসেছে, শাবানের প্রথম তারিখ রাতে বারো রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর পাঁচ বার সূরা ইখলাস পড়বে।
→এই নামাজ আদায়কারীকে আল্লাহ তাআলা বারো হাজার শহীদ এবং বারো বছরের ইবাদতের সাওয়াব দিবেন। ঐ নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি গুনাহ মুক্ত হয়ে সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে যাবে। আশি দিন পর্যন্ত তার গুনাহ লেখা হবে না। [ফাযায়েলে শুহূর, বারো মাসের নফল ইবাদত]
→আল্লাহ চাহে তো তার গুনাহ মাফ করে দিয়ে তাকে বেহেশতের উপযোগী করবেন।
[বারো মাসের নফল ইবাদত]
প্রথম জুমার রাতের নফল নামাজ:
শাবান মাসের প্রথম জুমার রাতে ইশার নামাজের পর এক সালামের সাথে চার রাকাত নামাজ পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর তিনবার সূরা ইখলাস পড়বে। এই নামাজের অনেক ফযিলত রয়েছে।
→এই নামাজ আদায়কারীকে একটি উমরার সাওয়াব দান করা হবে। [বারো মাসের নফল ইবাদত]
→ঈমানের উন্নতির জন্য এই নামায অত্যন্ত ফলপ্রদ।
[বারো মাসের নফল ইবাদত]
- শাবান মাসে রোজা:
إِنَّمَا سُمَّى شَعْبَانَ لأَنَّهُ يَنْشَعِبُ فِيهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ لِلصَّائِمِ فِيهِ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ
“এ মাসকে শা’বান এ কারণে বলা হয় যে, এ মাসে রোযা পালনকারীর জন্য অধিক পরিমাণে কল্যাণের শাখা প্রস্ফুটিত হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশ করে।” [আত তাদভীনু ফী আখবারি কাযবীন]
উল্লেখ্য, এ মাসেই পবিত্র রমযানুল মুবারকের রোযা ফরয হওয়ার নির্দেশ নাযিল হয়েছিল।
كَانَ أَحَبَّ الشُّهُورِ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنْ يَصُومَهُ شَعْبَانُ كَانَ يَصِلُهُ بِرَمَضَانَ
“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট রোযা পালনের জন্য সর্বাধিক পছন্দনীয় মাস ছিল শা’বান, তিনি এ রোযাকে রমযানের সাথে মিলিয়ে দিতেন। [আস্ সুনানুল কোবরা লিন নাসায়ী, খণ্ড- ৩, পৃ.২৫৪, হা/২৯২২]
يَا رَسُولَ اللهِ أَيُّ الصَّوْمِ أَفْضَلُ؟ قَالَ : ” صَوْمُ شَعْبَانَ تَعْظِيمًا لِرَمَضَانَ
“ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কোন রোযা সর্বোত্তম? হুযূর ইরশাদ করলেন: রমযানের সম্মানে শা’বানের রোযা। [বায়হাক্বী, আস্ সুনানুল কোবরা, খণ্ড- ৪, পৃ. ৫০৩, হা/৮৫১৭]
(সহীহ ইবনে হাববান ও মিশকাত শরীফ)
[বারো মাসের নফল ইবাদত, গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব]
১। আল্লামা শাহ সূফী আলম ফক্বরী রহ, বারো মাসের নফল ইবাদত
২। গাউসিয়া তারবিয়াতি নেসাব, আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক প্রকাশিত।
৩। মাওলানা মুহাম্মদ আবুল হাশেম সাহেব, ফযিলতপূর্ণ রজনীসমূহ।
৪। আল্লামা মুফতি আব্দুল ওয়াজেদ সাহেব মু.জি.আ, সৈয়্যদা ফাতেমা বাতুল বিনতে রসূল ﷺ।


