বার্ধক্যে রোজা: করণীয়, বর্জনীয় ও শরিয়তের সমাধান
আসসালামু আলাইকুম।
মাহে রমজানে বয়ষ্কা ও মুরব্বী মহিলাদের ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলেই মূলত দু’টি বিষয় অত্যধিকহারে সামনে আসে। প্রথমত, মেনোপজকালীন সময় তথা বয়ষ্কালীন অবস্থায় একটি প্রাকৃতিক জৈবিক ও শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা একজন মহিলার প্রজনন বছর শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। যখন একজন মহিলার মাসিক ছাড়াই টানা ১২ মাস চলে যায়। মেনোপজ সাধারণত পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সের মধ্যে ঘটে, তবে কিছু মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি আগে বা পরে ঘটতে পারে। । মাহে রমজান হল প্রতিফলন, ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা অনুশীলনের ধর্মীয় মাস। তবে, পেরিমেনোপজ এবং মেনোপজের সময় যে অনেক শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা যায়, তা ইবাদতের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে রমজান উদযাপনের সময়। রোজা লক্ষণগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ইবাদতের সময় আপনার শরীরে এর প্রভাব প্রতিরোধ করার উপায়গুলো বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
মেনোপজের লক্ষণস্বরূপ ক্লান্তি বাড়তে পারে, তাই মাস জুড়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্য খাবারের সময় কীভাবে স্বাস্থ্যকর পছন্দ করা যায় তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর সবুজ পাতার শাকসবজি, কম চিনিযুক্ত ফল যেমন আঙ্গুর, চর্বিহীন মাংস এবং ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ দুগ্ধজাত পণ্য যেমন চিনিমুক্ত দই খেতে পারেন। ক্যাফেইন, কার্বনেটেড পানীয়, ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং চিনি ও উচ্চ লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
গরমের আধিক্য ও রাতের ঘাম ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে, বিশেষ করে রোজা রাখার সময়। নিজেকে হাইড্রেটেড রাখতে সারা রাত ধরে পানি পান করুন, রমজানের সন্ধ্যার সময় হাতের কাছে পানি রাখুন। শসা, তরমুজ বা আপেলের মতো হাইড্রেটিং খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে নামাজের সময় ঠান্ডা, স্বস্তিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার মত কাপড় পড়ুন।
দ্বিতীয়ত, বয়ষ্কা বোনদের মাঝে রমজানের শেষ দশ দিনের অন্যতম সুন্নাত ও ফযীলতপূর্ণ ইবাদত
হিসেবে ইতেকাফ পালনের আন্তরিক সদিচ্ছা দেখা যায়। এক্ষেত্রে বলে রাখা প্রয়োজন, উপরোল্লিখিত স্বাস্থ্যকর খাবার ও সচেতনতাগুলোও যেমন শুধু বয়ষ্কাদের জন্য নয় বরং সকল বয়সী নারীদের জন্যই রমজানে মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনিভাবে ইতেকাফের মত তাৎপর্যবহ একটি ইবাদতও শুধুই বয়ষ্কা মুরুব্বীদের জন্য নির্দিষ্ট নয় বরং সব বয়সের নারীরাই এ ইবাদত করতে পারেন। যুবতী অবস্থায় যেকোন ইবাদতের জন্য শারীরিক সামর্থ যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান থাকে , যা প্রকারান্তরে বয়স্কালে আর থাকেনা। তাই ঘর- সংসারের দায়িত্ব যদি ব্যবস্থাপনা সুযোগ-সুবিধা সহকারে সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে যেকোন বয়সের নারীরাই রমজানে ইতেকাফ করতে চেষ্টা করতে পারেন।
এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ইতেকাফের জন্য বাকিসব মৌলিক নিয়ম একই হলেও পার্থক্যটুকু হচ্ছে, মেয়েরা ইতেকাফ ঘরে আদায় করবে। মহিলারা মসজিদে ইতিকাফ করা মাকরূহ। মহিলাদের ইতেকাফের বেলায় হায়েয, নিফাস থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী ও পূর্বশর্ত। ঘরে ইতেকাফের জন্য নির্ধারিত কামরা থেকে অকারণে বের হওয়া হারাম। সদা-সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল হয়ে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা জারী রাখতে হবে। এছাড়া বাকিসব মাসাইল নারী-পুরুষভেদে একইরকম বলে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলো না।
এছাড়াও, বর্তমান সমাজে দেখা যায় যে, খতমে তারাবীহর নামাজের জন্য আজকাল বিভিন্ন সোসাইটিতে বা মসজিদে আলাদাভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে। এতে ক্ষেত্রবিশেষে মহিলাদের জন্যও ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকে। যদিও সফরের প্রয়োজনে, হজ্বে-উমরায় বা নানাসময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রবিশেষে মহিলারা জামা’আতে বা মসজিদে নামায পড়ে থাকেন। তবে বর্তমান সমাজের কঠিন ফিতনা-ফাসাদের পরিস্থিতিতে, সাধারনভাবে সকল মহিলাকে জামা’আতে নামাজের উদ্দেশ্য করে বের করে নেয়াটাও বাতিলদের একধরণের প্রোপাগান্ডা বলা যেতে পারে। পুরুষের জন্য যেভাবে ঘরের চেয়ে মসজিদে গিয়ে বা জামাতে নামায আদায় করাকে সাতাশ গুণ বেশি সাওয়াবের বলা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনই সাওয়াব মেয়েদের জন্য, যদি সে নিজ গৃহের এক কোণে আলাদাভাবে আল্লাহর বন্দেগী পরিচ্ছন্নতার সাথে আদায় করে থাকে। অতএব, আমাদের পক্ষ থেকে মেয়েদের জামা’আতে নামায আদায় করাকে সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। তাই, সালাতুত তাসবীহ বা বিভিন্ন সুন্নত ও নফল নামায বর্তমানে মহিলারা যে আলাদাভাবে জামা’আতের আয়োজন করে আদায় করে থাকেন, তদপেক্ষা অত্যধিক উত্তম হল নারীরা নিজেদের ঘরে সাংসারিক সকল কার্যক্রম গুছিয়ে, প্রশান্তচিত্তে- ধীরেসুস্থে নিজের তারাবীহ’র নামাযসহ অন্যান্য বন্দেগি করবেন। আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন আমাদের মেয়েদের জন্য সর্বাবস্থায় দ্বীনকে সহজ করে দিলেও আমরা নিজেদের বিচার-বিশ্লেষণকে অধিক প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেকসময় ইসলামকে আমাদের জন্য কঠিন করে নেই।
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে মাহে রমজানের এই মহিমান্বিত সময়কে কেন্দ্র করে, একজন মুসলিম রমণী হিসেবে যথাযথ সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের সকলের জন্য অঢেল রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের করূণা লাভ নিশ্চিত করার তাওফিক দান করুন, আ-মীন। বিহুরমাতি সায়্যীদিল মুরসালীন সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তথ্যসূত্র- কানযুল ঈমান
গাউসিয়া তারবিয়াতী নিসাব
বাহারে শরীয়ত (৫ম খণ্ড)
ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার)
গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের “দা’ওয়াতে খায়র অনলাইন প্রশ্নোত্তর” হতে সংগৃহীত


