অনিয়মিত বা দীর্ঘ ঋতুস্রাব হলে রোজা নিয়ে বিভ্রান্ত? ইসলামের দিকনির্দেশনা কী বলছে?
মাসিক হায়েয জীবনের প্রাথমিকভাবে কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর, প্রতিটি মেয়েরই নিজস্ব শারীরিক বৈশিষ্ট্য, কাঠামোগত গঠন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থানের ভিন্নতার দরূণ একেক সময় হায়েয শুরু ও শেষ হয়। মাসিক একটি চক্র হিসেবে কারো কারো ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত ও কারো ক্ষেত্রে এটি অনিয়মিত হয়ে থাকে। তবে এসময় বিশেষ করে রোজার ব্যাপারে কিশোরী-যুবতীদের মাঝে কিছু দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয়। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকটি মেয়ের নিয়মিত বা অনিয়মিত হায়েযের মধ্যেও একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা থাকে, যেটি শুধু উক্ত মেয়ের সাথেই নির্দিষ্ট। তাই সেই ধারাবাহিকতার আলোকে সর্বনিম্ন ৩ দিন ৩ রাত ও সর্বোচ্চ ১০ দিন ১০ রাতের মধ্যকার সীমানায় যার যতদিন মাসিকের রক্ত প্রবাহিত হবে ততদিন বাদে বাকী সব দিনে অবশ্যই রমজানের রোজা রাখতে হবে।
- নারী যদি নিজের অভ্যাস অনুযায়ী বুঝতে পারে যে, আগামীকাল তার ঋতুস্রাব হবে। তাহলেও সে রোজা ভাঙবে না। তবে ঋতুস্রাব দেখতে পেলেই একমাত্র রোজা ভাঙতে পারবে। তিন দিন থেকে ১০ দিন পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে মাসিক ঋতুস্রাবকালীন নামাজ-রোজা বন্ধ রাখবে। কোনো কারণে ঋতুস্রাবের সময় ১০ দিনের চেয়ে বেড়ে গেলে নিজের আগের অভ্যাস অনুপাতে যে মেয়াদ রয়েছে, ওই দিন পর্যন্ত বন্ধ রেখে এরপর থেকে নামাজ-রোজা পালন করবে। আর যদি ১০ দিনের ভেতরই শেষ হয়ে যায়, তাহলে রক্ত আসার শেষ দিন পর্যন্ত ঋতুস্রাব গণ্য করে নামাজ-রোজা ইত্যাদি বন্ধ রাখবে।
- নারী যদি নিজের ঋতুস্রাবের পবিত্রতার নিদর্শন দেখতে পায়; যার দ্বারা বুঝতে পারে যে সে এখন পবিত্র হতে যাচ্ছে, তাহলে রাতেই রোজার নিয়ত করবে। আর যদি পবিত্রতার নিদর্শন না দেখা যায়, তাহলে ভেতরে তুলা-প্যাডজাতীয় কিছু পড়বে। যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, তাহলে রোজা সম্পূর্ণ রেখে দিবে। যদি দ্বিতীয়বার হায়েজের রক্ত এসে যায়, তাহলে সেই রোযাটিও পরবর্তীতে কাযা আদায় করে দিবে।
- রমজান মাসে সুবহে সাদেকের পর যদি কোনো মহিলার হায়েজ, নেফাস বন্ধ হয়ে যায় এবং সে এই সময়ের মধ্যে কোনো কিছু পানাহার না করে, এমতাবস্থায় যদি সে রোজার নিয়ত করে তাহলে ওই দিনের রোজা শুদ্ধ হবে না ববং পরবর্তীতে উক্ত রোজার কাজা করতে হবে, কারণ সে দিনের শুরুতে অপবিত্র ছিল।
- রোজার সময়সীমা হচ্ছে সুবহে সাদেক্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সূর্য অস্ত যাওয়ার এক মুহূর্ত আগেও যদি রোজা ভঙ্গ হওয়ার কোন কারণ সংঘটিত হয়, তাহলে উক্ত দিনের রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং এর পরিবর্তে পরবর্তীতে রোজা ক্বাযা করতে হবে। অতএব, যদি সূর্য ডোবার আগেই পিরিয়ড শুরু হয়ে যায় তাহলে উক্ত দিনের রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
স্মর্তব্য যে, ফরজ গোসল আদায়ের সাথে রোজা রাখার সম্পর্ক নেই, যদি কোন কারণে হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য ফরয গোসল অনাদায়ী থেকে যায়, অথচ হায়েয থেমে গেছে, এমতাবস্থায় অবশ্যই সে পরবর্তী রোযাটি শুরু করে দিবে এবং দ্রুততার সাথে ফরজ গোসল আদায় করে যথারীতি নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত আদায় করবে।
গোসলের ফরয তিনটিঃ ১. গড়গড়াসহ ভালোভাবে কুলি করা, ২. নাকে পানি দেওয়া, ৩. সমস্ত শরীর একবার ভালোভাবে ধোয়া যাতে শরীরের কোন জায়গা শুষ্ক না থাকে।
উক্ত ফরয তিনটি আদায় হলেই গোসল শুদ্ধ হবে। তবে রোজা অবস্থায় কুলি করার সময় গড়গড়া করা এবং নাকের নরম হাড্ডি পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে না৷ কেননা এতে পানি ভিতরে চলে গিয়ে রোজা ভঙ্গ হয়ে যেতে পারে। ফরজ গোসলে মহিলাদের লজ্জাস্থানের বাহ্যিক অংশে পানি পৌঁছালে ফরজ আদায় হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ অংশে পানি পৌঁছানো জরুরি নয়। আর রোজা অবস্থায় মহিলাদের ভেতরের অংশে যেন পানি না পৌঁছে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা ভেতরে যাওয়ার দ্বারা রোজা ভেঙে যেতে পারে। রোজাবস্থায় শরীরে নাভীর নিম্নস্থ অবাঞ্ছিত লোম, নখ ইত্যাদি কাটা জায়েয৷ কারণ, এগুলো রোজা ভঙ্গের কারণের মধ্যে পরে না৷
পিরিয়ডের কারণে রোজা না রেখে দিন শুরু করার পর পিরিয়ড বন্ধ হলে পবিত্র হওয়ার পর বাকিদিন রোযাদারের ন্যায় পানাহার না করা ওয়াজিব। কিন্তু এ দিনের রোজাও পরে কাজা করে নিতে হবে। যেহেতু রোজাটি সম্পূর্ণ হয়নি।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে মা আয়েশা সিদ্দীকা (রঃ)’র রেওয়ায়েত অনুযায়ী বিশুদ্ধ হাদীসের আলোকে, হায়েযের কারণে বাদ পড়ে যাওয়া ফরয নামাজের কাযা আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে আমাদের জন্য মাফ করা হয়েছে, তবে রমজানের ফরজ রোজাসমূহের কাযা পরবর্তীতে নিজ নিজ সুবিধাজনক সময়ে অবশ্যই আদায় করে দিতে হবে।
আর যদি রোজা অবস্থায়ও কারো মাসিকের চিহ্ন দেখা দেয়, তখন সেদিনের রোজাটিও ভেঙ্গে যাবে এবং তা সহই পরবর্তীতে আদায় করে দিতে হবে। এসময় মেয়েরা চাইলে রোজাবিহীন দিনসমূহে স্বাভাবিক পানাহার করতে পারবে, এতে কোন ক্ষতি নেই। তবে মাহে রমজানের ভাবগাম্ভীর্যতা রক্ষার্থে ও রোযাদারদের সম্মানে লোকসম্মুখে এসে প্রকাশ্যে খাবার-পানীয় গ্রহণ করা উচিত নয়। এছাড়াও এ অবস্থায় মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বসে সাহরী-ইফতারের বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
তথ্যসূত্র- কানযুল ঈমান; গাউসিয়া তারবিয়াতী নিসাব বাহারে শরীয়ত (৫ম খণ্ড) ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার)
গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের “দা’ওয়াতে খায়র অনলাইন প্রশ্নোত্তর” হতে সংগৃহীত


